ঘরে বসে নিজে রুকইয়াহ করার সহজ পদ্ধতি
ইসলাম আমাদের আত্মা, মন ও দেহের সমস্যার ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক দোয়া ও আমলকে নির্দিষ্ট চিকিৎসা হিসেবে দিয়েছে। রুকইয়াহ হচ্ছে সেই বৈধ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মানুষ সিহর, জ্বিনের আছর, বদনজর, মানসিক যন্ত্রণা বা অজানা ভয় থেকে আল্লাহর সাহায্যে মুক্তি পেতে পারে। রুকইয়াহ করতে বিশেষ কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন নেই; একজন মুসলিম নিজেই ঘরে বসে কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী রুকইয়াহ করতে পারে।
এই নিবন্ধে আমরা ঘরে বসে নিজে রুকইয়াহ করার সম্পূর্ণ সহজ পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় আয়াত-দোয়া, সতর্কতা, সময় এবং রুকইয়াহ প্রক্রিয়াকে কার্যকর করার বাস্তব পরামর্শ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
1 রুকইয়াহ কী এবং কেন প্রয়োজন
রুকইয়াহ হলো কুরআনের আয়াত ও সহিহ দোয়া দ্বারা চিকিৎসা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে রুকইয়াহ করতেন এবং সাহাবাদেরও করতেন। বৈধ রুকইয়াহর মূল শর্ত হচ্ছে এতে শিরক বা কোন মন্ত্র-তন্ত্র, অজানা ভাষা, জ্যোতিষ বা কুফরি কিছু না থাকা।
যে কারনে রুকইয়াহ করা হতে পারে:
- সিহর বা জাদুর প্রভাব
- জ্বিনের আছর
- বদনজর
- ভয়, উদ্বেগ, দুঃস্বপ্ন
- অস্থিরতা বা মানসিক চাপ
- অজানা শারীরিক অসুস্থতা যা সাধারণ চিকিৎসায় সেরে উঠছে না
রুকইয়াহ একটি আধ্যাত্মিক চিকিৎসা, এটি শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার বিকল্প নয় বরং পরিপূরক।
ঘরে বসে নিজে রুকইয়াহ করার প্রস্তুতি
রুকইয়াহ শুরু করার আগে কিছু বিষয় জানা গুরুত্বপূর্ণ:
১. নিয়ত
আপনার নিয়ত হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার উদ্দেশ্যে রুকইয়াহ করা। রুকইয়াহ কোনো জাদু বা রহস্য নয়। এটি ইবাদত।
২. পরিষ্কার পরিবেশ
ঘর পরিষ্কার রাখা, অশ্লীল ছবি বা গান ইত্যাদি না থাকা জরুরি। কারণ ফেরেশতারা পবিত্র স্থানে অবতরণ করেন।
৩. যেসব সময়ে করা ভালো
- ফজরের পর
- মাগরিবের পর
- ঘুমানোর আগে
ব্যস্ততার মধ্যে দিনে যেকোনো সময়ও করতে পারেন।
৪. অজু করে নেয়া
অজু অবস্থায় রুকইয়াহ করলে মনোযোগ বাড়ে এবং সাওয়াবও পাওয়া যায়।
ঘরে বসে নিজে রুকইয়াহ করার সহজ ধাপভিত্তিক পদ্ধতি
এখন রুকইয়াহর আসল প্রক্রিয়া শুরু করা যাক।
ধাপ ১: সূরা ফাতিহা পড়া
সূরা ফাতিহা রুকইয়াহর মূল। এটি শifa’র সূরা।
পড়ার নিয়ম:
- আপনার দুই হাত সামনে তুলে ফাতিহা পড়ুন।
- তারপর দু’হাতে ফুঁ দিয়ে নিজের মাথা, মুখ, বুক ও শরীরের ওপর বুলিয়ে দিন।
- চাইলে পানি বা অলিভ অয়েলেও ফুঁ দিতে পারেন। পরে তা পান করা বা শরীরে লাগানো যায়।
ধাপ ২: আয়াতুল কুরসি
আয়াতুল কুরসি জিন-শয়তান দূর করার সবচেয়ে শক্তিশালী আমল।
রুকইয়াহর সময় আয়াতুল কুরসি ধীরে ধীরে অর্থ বুঝে পড়ুন। ঘুমানোর সময়ও এটি পড়লে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
ধাপ ৩: সূরা বাকারা থেকে গুরুত্বপূর্ণ আয়াত
যদি সম্পূর্ণ সূরা বাকারা পড়তে না পারেন, তাহলে অন্তত নিম্নোক্ত আয়াতগুলো পড়ুন:
- সূরা বাকারা ১-৫ নং আয়াত
- আয়াতুল কুরসি (২৫৫)
- সূরা বাকারা ২৮৪-২৮৬ (শেষ তিন আয়াত)
এগুলো সিহর ও জ্বিনের আছরের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর।
ধাপ ৪: সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস
এই তিনটি সূরা রুকইয়াহর সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ।
নুন্যতম তিনবার, যদি পারেন সাতবার পড়ুন।
পড়ার পর হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে বুলিয়ে নিন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর আগে এভাবেই নিজের ওপর রুকইয়াহ করতেন।
ধাপ ৫: নির্দিষ্ট দোয়া
নিচে রুকইয়াহর সহিহ দোয়া উল্লেখ করা হলো:
১. রোগ ও কষ্ট দূর করার দোয়া:
আল্লাহুম্মা রব্বান্নাস, আজহিবিল বা’স, ইশফি আনতা আশ-শাফি, লা শিফা’আ ইল্লা শিফাউকা, শিফাউঁ লা ইউগাদিরু সাকামা।
২. বদনজর ও জ্বিন দূর করার দোয়া:
আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত্তাম্মাতি মিন শার্রি মা খালাক।
৩. সম্পূর্ণ রুকইয়াহ দোয়া:
বিসমিল্লাহি উরকিক, মিন কুল্লি শাই’ইন ইউ’জিক, মিন শার্রি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদ, আল্লাহু ইয়াশফিক, বিসমিল্লাহি উরকিক।
এই দোয়া তিনবার বা সাতবার পড়ুন।
রুকইয়াহ পানি ও রুকইয়াহ তেল তৈরি করার সহজ উপায়
রুকইয়াহ পানি তৈরির পদ্ধতি:
১. এক গ্লাস বা বোতল পানি নিন।
২. ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, নাস, ইখলাস পড়ুন।
৩. প্রতিটি পড়ে পানিতে ফুঁ দিন।
৪. সেই পানি দিনে ২–৩ বার পান করুন।
৫. চাইলে গোসলের পানিতেও মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।
রুকইয়াহ তেল (অলিভ অয়েল):
১. অলিভ অয়েল একটি ছোট বোতলে নিন।
২. একইভাবে আয়াতগুলো পড়ে তেলে ফুঁ দিন।
৩. রাতে ঘুমানোর আগে পেট, বুক, মাথা বা ব্যথার স্থানে লাগাতে পারেন।
রুকইয়াহ চলাকালীন সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া
অনেকেই রুকইয়াহ করলে বিভিন্ন শারীরিক বা মানসিক প্রতিক্রিয়া অনুভব করেন। এগুলো সাধারণ:
- মাথা ব্যথা
- অতিরিক্ত হাই
- বুক ধড়ফড়
- ঘুম ঘুম ভাব
- কান্না পেয়ে যাওয়া
- শরীরে গরম বা ঠান্ডা অনুভব
- ভয় বা অস্থিরতা
এসব প্রতিক্রিয়া সাধারণত ভালো লক্ষণ, কারণ শরীর থেকে ক্ষতিকর প্রভাব বের হয়ে যায়।
রুকইয়াহর সময় যেসব ভুল এড়াতে হবে
১. মন্ত্র-তন্ত্র, ঝাড়ফুঁক, বাদশাহি তাবিজ, কালো বা সাদা জাদুর কোনো উপাদান ব্যবহার করা যাবে না।
২. কোনো অজানা ভাষা বা অর্থহীন কথা বলা যাবে না।
৩. রুকইয়াহর নামে কারো শরীরে আগুন, ছুরি, দড়ি, লাথি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- রুকইয়াহ করার সময় সঙ্গীত বা গান চালিয়ে রাখা ব্যাহত করবে।
- কারও ওপর নির্ভর হওয়া ঠিক নয়; আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে।
রুকইয়াহকে কার্যকর করার ১০টি বাস্তব পরামর্শ
১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ঠিক রাখা
২. প্রতিদিন সকালে-সন্ধ্যায় মাসনুন আজকার
৩. ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি এবং তিন কুল
৪. ঘর থেকে অশ্লীল ছবি, মিউজিক বা শয়তানি উপকরণ সরিয়ে ফেলা
৫. নিয়মিত সূরা বাকারা তিলাওয়াত
৬. নফস ও গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা
৭. পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ওপর রুকইয়াহ করা
৮. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা
৯. যদি সমস্যা গভীর হয়, ধারাবাহিকভাবে অন্তত ৭ দিন রুকইয়াহ করা
১০. চিকিৎসা লাগলে অবশ্যই ডাক্তার দেখানো, কারণ ইসলাম চিকিৎসাকে অনুমোদন দিয়েছে
রুকইয়াহ কখন দ্রুত কার্যকর হয়?
- যখন নিয়ত খাঁটি থাকে
- যখন তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে করা হয়
- যখন গুনাহ পরিহার করা হয়
- যখন ধারাবাহিকতা বজায় থাকে
- যখন ঘরের পরিবেশ পবিত্র থাকে
রুকইয়াহ সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা যাক
অনেকে মনে করেন রুকইয়াহ শুধু পীর বা হুজুর করতে পারে।
এটি সঠিক নয়।
বৈধ রুকইয়াহ আপনি নিজেই করতে পারবেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন যে একজন মুসলিম নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং অন্যের জন্যও রুকইয়াহ করতে পারে।
উপসংহার
ঘরে বসে রুকইয়াহ করা অত্যন্ত সহজ এবং তা কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী করলে আল্লাহর সাহায্য ও শিফা পাওয়া নিশ্চিত। কোনো রহস্যময় বা কুফরি পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। শুধু খাঁটি নিয়ত, আল্লাহর প্রতি ভরসা, নিয়মিত আমল এবং মনোযোগ দিয়ে কুরআন তিলাওয়াতই রুকইয়াহকে সফল করে।
যারা নিয়মিতভাবে রুকইয়াহ শিখে করতে চান, তারা চাইলে রুকইয়াহ কোর্স দেখতে পারেন:
https://learnruqyah.net/step/the-ruqyah-course/
আর ভিডিও লেসন দেখতে পারেন:
https://www.youtube.com/@learnruqyah

