ভূমিকা
গর্ভাবস্থা আল্লাহর এক মহামূল্যবান নিয়ামত, কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে মা ও গর্ভস্থ সন্তান দুজনই নানা শারীরিক ও আত্মিক প্রভাবের মুখোমুখি হয়। ইসলামী দৃষ্টিতে শয়তান, জ্বিন ও বদনজরের প্রভাব থেকেও মা ও সন্তানকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী রুকইয়াহ শারইয়াহ—অর্থাৎ কুরআনি আমল ও দোয়ার মাধ্যমে আত্মিক সুরক্ষা লাভ করা—এক্ষেত্রে সর্বোত্তম পদ্ধতি।
রুকইয়াহ কী ও কেন প্রয়োজন
“রুকইয়াহ” অর্থ— কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আমল বা দোয়া পাঠ করে আল্লাহর কাছে শিফা (আরোগ্য) প্রার্থনা করা। এটি কোনো জাদু বা মন্ত্র নয়, বরং ইসলামী আত্মিক চিকিৎসা। গর্ভবতী মায়ের শরীর ও মন দুটোই নাজুক অবস্থায় থাকে, তাই রুকইয়াহর মাধ্যমে তাকে মানসিক প্রশান্তি, আত্মিক সুরক্ষা ও আল্লাহর রহমত লাভের সুযোগ দেয়।
নবী করিম (সা.) বলেছেন:
“যে কেউ রুকইয়াহ করে এবং তাতে শির্কের কোনো উপাদান নেই, তা বৈধ।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: 2200)
গর্ভবতী মায়ের জন্য রুকইয়াহ করার উপকারিতা
১. শয়তানের প্রভাব ও ভয় দূর হয়।
২. গর্ভস্থ শিশুর ওপর বদনজর ও যাদুর প্রভাব কমে।
৩. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ হ্রাস পায়।
৪. শিশুর আত্মিক বিকাশে সহায়তা করে।
৫. ঘর ও পরিবেশে বরকত বৃদ্ধি পায়।
গর্ভবতী মায়ের জন্য রুকইয়াহ করার নিয়ম
১. কুরআন তেলাওয়াত করা
গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন কুরআন তেলাওয়াত করা উচিত। বিশেষত নিচের সূরাগুলো পড়া খুব উপকারী—
- সূরা আল-ফাতিহা
- সূরা আল-বাকারা (২৮৫–২৮৬)
- সূরা আল-ইখলাস
- সূরা আল-ফালাক
- সূরা আন-নাস
এই সূরাগুলো পাঠ করে নিজের উপর, গর্ভস্থ সন্তানের উপর এবং পেটের দিকে ফুঁ দিলে রুকইয়াহ সম্পন্ন হয়।
২. আয়াতুল কুরসি পাঠ
নবী করিম (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসি পাঠ করে, তার ঘরে সারা রাত শয়তান প্রবেশ করতে পারে না।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: 2311)
গর্ভবতী মায়ের উচিত ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করে ফুঁ দেয়া এবং নিজের উপর হাত বুলিয়ে নেওয়া।
৩. রুকইয়াহ পানি পান ও ব্যবহার
এক গ্লাস পানির উপর সূরা আল-ফাতিহা, সূরা আল-ইখলাস, সূরা আল-ফালাক, সূরা আন-নাস এবং আয়াতুল কুরসি পাঠ করে ফুঁ দিয়ে পান করা যেতে পারে।
এ পানি গর্ভবতী মাকে সুরক্ষা দেয় এবং মানসিক প্রশান্তি আনে।
৪. সকাল ও সন্ধ্যার যিকির
গর্ভবতী মায়ের জন্য সকাল-সন্ধ্যার যিকির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—
بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
অর্থ: “আল্লাহর নামে, যার নামে কোনো কিছু ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
(আবু দাউদ, হাদিস: 5088)
প্রতিদিন তিনবার এই দোয়া পাঠ করলে আল্লাহর সুরক্ষা পাওয়া যায়।
নবজাতকের জন্য রুকইয়াহ করার নিয়ম
১. আজান ও ইকামত
শিশুর জন্মের পর নবী করিম (সা.) এর সুন্নাহ হলো— ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত বলা। এটি নবজাতককে শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
২. নবজাতকের উপর কুরআন পাঠ
নবজাতকের পাশে বা মাথার কাছে নিচের সূরাগুলো পাঠ করা যেতে পারে:
- সূরা আল-ফাতিহা
- সূরা আল-ইখলাস
- সূরা আল-ফালাক
- সূরা আন-নাস
এরপর শিশুর মুখ বা মাথার দিকে হালকাভাবে ফুঁ দিতে হবে। এতে আল্লাহর রহমত ও সুরক্ষা লাভ হয়।
৩. রুকইয়াহ দোয়া শিশুর জন্য
أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
অর্থ: “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে আশ্রয় দিচ্ছি, প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও বদনজর থেকে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: 3371)
নবী করিম (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য এই দোয়াটি পাঠ করতেন।
৪. শিশুর ঘরে কুরআন তেলাওয়াত
নবজাতকের ঘরে প্রতিদিন সূরা আল-বাকারা বা এর কিছু অংশ পাঠ করলে শয়তান দূরে থাকে এবং পরিবেশ পবিত্র হয়।
গর্ভবতী মা ও নবজাতকের সুরক্ষার অতিরিক্ত পরামর্শ
১. হারাম গান, তাবিজ বা অশ্লীল জিনিস থেকে দূরে থাকা।
২. ঘরে নামাজ ও কুরআন পাঠ চালু রাখা।
৩. নিয়মিত দোয়া, যিকির ও সালাতুল হাজত আদায় করা।
৪. সদা পবিত্র থাকা ও ভালো পরিবেশে থাকা।
৫. আত্মবিশ্বাসী থাকা এবং আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভর করা।
গর্ভবতী মায়ের মানসিক প্রশান্তির জন্য রুকইয়াহ আমল
- প্রতিদিন সকালে ও রাতে সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস তিনবার করে পাঠ করা।
- “হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হু” এই দোয়াটি অন্তত ৭ বার পাঠ করা।
- নামাজ শেষে আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া করা।
- নিজে ও গর্ভস্থ সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করা—
“হে আল্লাহ, এই সন্তানকে সৎ, ঈমানদার ও নেক বানিয়ে দাও।”
রুকইয়াহ শেখার জন্য নির্দেশনা
যারা নিজে বা পরিবারের জন্য রুকইয়াহ শিখতে চান, তারা বিস্তারিত জানতে পারেন এখানে:
রুকইয়াহ শেখার কোর্স
এখানে ধাপে ধাপে শেখানো হয়েছে কিভাবে গর্ভবতী মা, নবজাতক বা পরিবারের সদস্যদের ওপর কুরআনি রুকইয়াহ করা যায়।
রুকইয়াহ সম্পর্কিত ভিডিও ও দোয়া শোনার জন্য ভিজিট করুন
Learn Ruqyah YouTube Channel
উপসংহার
গর্ভবতী মা ও নবজাতকের জন্য রুকইয়াহ করা শুধুমাত্র একটি আত্মিক সুরক্ষা নয়, এটি একটি ঈমানি আমলও বটে। কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী নিয়মিত রুকইয়াহ করলে আল্লাহ তায়ালা মা ও সন্তান উভয়কেই শয়তানের প্রভাব, বদনজর ও সিহর থেকে সুরক্ষিত রাখেন। রুকইয়াহ মানসিক প্রশান্তি দেয়, ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং আল্লাহর রহমতের দ্বার খুলে দেয়।

