শিশু ও পরিবারের জন্য নিরাপদ রুকইয়াহ দোয়া

ভূমিকা

বর্তমান যুগে জাদু, বদনজর, জ্বিনের আছর, ভয়-উদ্বেগ, ও মানসিক অস্থিরতা—এসব সমস্যা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের নয়, শিশু ও পরিবারের প্রতিটি সদস্যকেও আক্রান্ত করছে। ইসলাম এসব বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কুরআন ও সহিহ হাদীসের মাধ্যমে একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে—রুকইয়াহ শারইয়াহ
এই লেখায় আমরা জানবো শিশু ও পরিবারের জন্য নিরাপদ রুকইয়াহ দোয়া, এর পদ্ধতি এবং করণীয় বিষয়গুলো।


শিশু ও পরিবারের জন্য নিরাপদ রুকইয়াহ দোয়া

রুকইয়াহ কী?

‘রুকইয়াহ’ শব্দটি আরবি, যার অর্থ পাঠ করে চিকিৎসা করা
এটি কুরআনের আয়াত ও সহিহ দোয়া পড়ে আল্লাহর নিকট শেফা প্রার্থনার একটি ইসলামিক চিকিৎসা পদ্ধতি।
রুকইয়াহ কোনো যাদু বা তাবিজ নয়; বরং এটি একেবারে শরীয়াহসম্মত দোয়া, যা নবী করিম ﷺ নিজে, সাহাবারা এবং সালাফগণ ব্যবহার করতেন।


শিশুদের জন্য রুকইয়াহ কেন জরুরি

শিশুরা মানসিক ও আত্মিকভাবে দুর্বল থাকে, তাই বদনজর, ভয়, বা জিনের প্রভাব সহজেই তাদের ওপর পড়তে পারে।
অনেক সময় দেখা যায়—

  • শিশু হঠাৎ করে কাঁদে বা ঘুমাতে চায় না,
  • অকারণে ভয় পায় বা চমকে ওঠে,
  • ক্ষুধামন্দা বা জেদি আচরণ করে,
  • চিকিৎসা করেও নিরাময় হয় না।

এসব ক্ষেত্রে রুকইয়াহ অত্যন্ত উপকারী।


রুকইয়াহ করার আগে কিছু প্রস্তুতি

১. বিশুদ্ধ নিয়ত করুন: চিকিৎসা কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়।
২. নজর বা জাদুর সন্দেহ থাকলে তাওয়াক্কুল রাখুন।
৩. ঘরে পবিত্রতা বজায় রাখুন: অশ্লীল ছবি, গান, বা অশুদ্ধ বস্তু ঘরে যেন না থাকে।
৪. রুকইয়াহ করার সময় শুধুমাত্র আল্লাহর সাহায্য চাওয়া জরুরি।


শিশুদের জন্য নিরাপদ রুকইয়াহ দোয়া

১️⃣ নবী করিম ﷺ এর শেখানো শিশুদের রুকইয়াহ দোয়া

أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

উচ্চারণ: U‘īdhukumā bi kalimātillāhit-tāmmati min kulli shayṭānin wa hāmmah, wa min kulli ‘aynin lāmmah.

অর্থ: “আমি তোমাদের আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ বাণীর মাধ্যমে আশ্রয় দিচ্ছি, সকল শয়তান, বিষধর প্রাণী ও বদনজর থেকে।”
(সহিহ বুখারি: 3371)

ব্যবহার:
নবী ﷺ এই দোয়া হাসান ও হুসাইন (রাঃ)-এর ওপর পড়তেন। আপনি আপনার সন্তানদের ওপরও এই দোয়া প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় তিনবার পড়তে পারেন।


২️⃣ সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস

এই দুটি সূরা রুকইয়াহর মূল অস্ত্র

“কুল আউযু বিআরাব্বিল ফালাক…”
“কুল আউযু বিআরাব্বিন নাস…”

ব্যবহার:

  • রাতে ঘুমানোর আগে শিশুদের ওপর তিনবার পড়ুন।
  • শিশুর শরীর ও মাথায় হালকা ফুঁ দিন।
  • চাইলে আপনার হাত শিশুর মাথা, বুক ও পিঠে বুলিয়ে দিন।

৩️ সূরা আল-ইখলাস, ফালাক ও নাস একত্রে

রসুল ﷺ রাতে ঘুমানোর আগে নিজে এই তিন সূরা পড়ে হাতে ফুঁ দিতেন এবং শরীরের সব অংশে হাত বুলাতেন (সহিহ বুখারি 5017)।

পদ্ধতি:
১. তিন সূরা পড়ুন।
২. হাতে ফুঁ দিন।
৩. শিশুর শরীরে তিনবার বুলিয়ে দিন।


৪️ সাধারণ দোয়া (সবাইয়ের জন্য উপযোগী)

بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

উচ্চারণ: Bismillāhilladhī lā yaḍurru ma‘asmihi shay’un fil-arḍi wa lā fis-samā’i wa huwa as-samī‘ul-‘alīm.

অর্থ: “আল্লাহর নামে, যার নামে আকাশ ও জমিনে কোনো কিছুরই ক্ষতি হয় না। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
(সহিহ তিরমিজি: 3388)

ব্যবহার:

  • সকালে ও সন্ধ্যায় তিনবার পড়লে আল্লাহ শিশুকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখেন।

পরিবারের জন্য রুকইয়াহর আমল

ঘুমানোর আগে

১. আয়াতুল কুরসী (সূরা বাকারা: ২৫৫)
২. সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস
৩. দোয়া: “আল্লাহুম্মা বিস্মিকা আমুতু ওয়া আহইয়া।”

সকালে ও বিকেলে

  • তিনবার করে নিচের দোয়া পড়ুন:

“আউযু বি কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক।”
(সহিহ মুসলিম: 2708)

ঘরের সুরক্ষার জন্য

  • সূরা আল-বাকারা নিয়মিত ঘরে তেলাওয়াত করুন বা চালু রাখুন।
  • নবী ﷺ বলেছেন: “যে ঘরে সূরা আল-বাকারা তেলাওয়াত করা হয়, সেখানে শয়তান প্রবেশ করে না।” (সহিহ মুসলিম 780)

রুকইয়াহ করার ধাপে ধাপে পদ্ধতি

১️ নিয়ত করুন: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ও শেফার উদ্দেশ্যে।
২️ হাতে বা পানিতে ফুঁ দিন: কুরআনের আয়াত বা দোয়া পড়ে পানিতে ফুঁ দিন।
৩️ সে পানি দিয়ে শিশুকে গোসল করান বা পান করান।
৪️ বিছানায় শোয়ার আগে আয়াতুল কুরসী ও তিন কুল পড়া অভ্যাস করুন।
৫️ রুকইয়াহ চলাকালীন নিষিদ্ধ কাজ (সঙ্গীত, টিভি, ঝগড়া) এড়িয়ে চলুন।


ঘর ও পরিবারের সুরক্ষায় অতিরিক্ত দোয়া

اللَّهُمَّ احْفَظْ أَهْلِي وَبَيْتِي مِنَ الشَّيَاطِينِ وَالْعَيْنِ وَالسُّوءِ

অর্থ: “হে আল্লাহ! আমার পরিবার ও ঘরকে শয়তান, বদনজর ও অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন।”

এই দোয়াটি নিজের ভাষায়ও আল্লাহর কাছে চাওয়া যেতে পারে।


রুকইয়াহ করার সময় করণীয় ও বর্জনীয়

করণীয়

  • নামাজ নিয়মিত আদায় করা
  • সকাল–সন্ধ্যার আমল পড়া
  • ঘর পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখা
  • ইসলামী পরিবেশ বজায় রাখা

বর্জনীয়

  • তাবিজ, কবচ, মন্ত্র, ফুঁ-ঝাড়ফুঁক ব্যবহার করা
  • জ্যোতিষ বা অদ্ভুত পদ্ধতির চিকিৎসা নেওয়া
  • গাফিল হয়ে রুকইয়াহ বন্ধ করে দেওয়া

উপসংহার

রুকইয়াহ একটি সুন্দর, নিরাপদ ও সহিহ ইসলামী চিকিৎসা পদ্ধতি, যা আল্লাহর বাণীর মাধ্যমে শেফা দেয়।
শিশুদের সুস্থতা, ঘরোয়া শান্তি ও পারিবারিক সুরক্ষার জন্য প্রতিদিন রুকইয়াহর দোয়া পাঠ করা অত্যন্ত কল্যাণকর।

“আর আমরা কুরআনে এমন কিছু নাজিল করেছি, যা মুমিনদের জন্য শেফা ও রহমত।”
(সূরা আল-ইসরা: ৮২)


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top